তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সংঘাত চরমে পৌঁছলেও শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীক বা ‘আসল তৃণমূল’-এর দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না বিদ্রোহী সাংসদরা। বরং সাংসদ পদ রক্ষার কৌশল হিসেবে লোকসভার ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদের ঠিকানা হল কার্যত একটি রাজনৈতিক দল—‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)।
নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালে আনরেজিস্টার্ড রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল এনসিপিআই। হাওড়ার সাঁকরাইলের হাটগাছা গ্রামে দলের সদর দপ্তর। ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। ভোটও পেয়েছিল খুব সামান্য।
রাজনৈতিক মহলের মতে, কার্যত নিষ্ক্রিয় এই দলকেই আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিদ্রোহী সাংসদরা, যাতে দলত্যাগ বিরোধী আইনের ফাঁদ এড়ানো যায়।
সোমবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করার কথা থাকলেও, রবিবারই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত তিন পাতার একটি চিঠি নিয়ে স্পিকারের বাসভবনে পৌঁছে যান তৃণমূলের দুই সাংসদ কীর্তি আজাদ ও সাগরিকা ঘোষ। ওই চিঠিতে দাবি করা হয়, তৃণমূল একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল এবং বিদ্রোহী সাংসদদের কোনও পৃথক ব্লকের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়।
এর পর আর অপেক্ষা করেননি কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ শিবির। রবিবার রাতেই তাঁরা স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের তৃণমূল থেকে পৃথক করার কথা জানান। সূত্রের খবর, মোট ১৯ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। বিদেশে থাকায় রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষর ই-মেলের মাধ্যমে পাঠানো হয়, যাতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপ এড়ানোর চেষ্টা করা যায়।
তবে এই পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিবাল এবং লোকসভার প্রাক্তন মহাসচিব ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ পি ডি টি আচারিয়া। তাঁদের বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতীকে নির্বাচিত সাংসদরা নিজেদের ইচ্ছায় অন্য দলে মিশে যেতে পারেন না। মূল রাজনৈতিক দল অন্য কোনও দলে একীভূত হলে তবেই এমন পরিস্থিতি সম্ভব। কপিল সিবালের মন্তব্য, ‘‘বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদদের এই পদক্ষেপ নিছক তামাশা। এঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়া উচিত।’’
এর আগে রবিবার বিকেলে ১৭ জন বিদ্রোহী সাংসদ দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বৈঠক করেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরও দু’জন সাংসদ। যদিও সূত্রের খবর, এই মুহূর্তে তৃণমূল ছেড়ে আসা কোনও সাংসদকে সরাসরি বিজেপিতে নিতে রাজি নয় গেরুয়া শিবির। সেই কারণেই আপাতত বিকল্প রাজনৈতিক আশ্রয়ের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
এদিন সকালে কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে ২২ জন সাংসদ রয়েছেন। যদিও বাকি দু’জনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই রাতে দিল্লির বঙ্গভবনে নৈশভোজের আয়োজন করেন বিদ্রোহী সাংসদরা। বাঙালি খাবারের সম্ভারে সাজানো সেই ভোজে ছিল ভাত, লুচি, মুগ ডাল, আলুর দম, পটলের দোলমা, ইলিশ ভাপা, মাটন কষা থেকে শুরু করে মিষ্টি দই, সন্দেশ ও রাজভোগ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আবহে সেই নৈশভোজই যেন বিদ্রোহী শিবিরের নতুন যাত্রার প্রতীক হয়ে উঠল।
