চার দশকের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, ত্যাগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ফলেই আজ আল আমীন মিশন বাংলার সংখ্যালঘু শিক্ষা আন্দোলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জেলার মধ্যে থেকেও মুর্শিদাবাদ আজ রাজ্যের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলেছে, এমনই মন্তব্য করলেন আল আমীন মিশনের সম্পাদক তথা সংখ্যালঘু মুসলিম পরিচালিত শিক্ষা মিশনের অগ্রদূত এম নুরুল ইসলাম।
তিনি টিডিএন বাংলাকে বলেন, ” মহান রবের ইচ্ছায় আল আমীন মিশন আজ আর একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র নয়, এটি একটি বিরাট মহীরুহ বটবৃক্ষ। প্রায় ৪০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে এই মিশন নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতি গঠনের কাজ করে চলেছে।”
তিনি জানান, বর্তমানে আল আমীন মিশনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার সদস্য। তার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা। শুধু তাই নয়, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষায় যাঁরা সাফল্য পাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যেও এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রছাত্রী মুর্শিদাবাদের।
চলতি বছরে আল আমীন মিশনের বিভিন্ন শাখায় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মোট ৩০ হাজার ৫৭৫ জন ছাত্রছাত্রী। আসন সংখ্যা সীমিত হওয়ায় মোট পরীক্ষার্থীর মাত্র ১৪ শতাংশ ছাত্রছাত্রীকে ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আর এদের এক তৃতীয়াংশ মুর্শিদাবাদের।
এই প্রসঙ্গে এম নুরুল ইসলাম বলেন, “মিশনের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকদের আস্থা বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর বহু যোগ্য ছাত্রছাত্রীকে আমরা ভর্তির সুযোগ দিতে পারছি না, এটা আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় কষ্ট।”
অতিরিক্ত ছাত্রছাত্রীর চাপ কমানো এবং মেধাবীদের আরো সুযোগ দিতে, আগামী বছর থেকে ভর্তি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন তিনি। সম্পাদকের কথায়, কমিটিতে আলোচনা হয়েছে, ভবিষ্যতে আর প্রথম ধাপে সরাসরি ভর্তি নেওয়া হবে না।
নতুন ব্যবস্থায় প্রথমে নেওয়া হবে প্রিমিলিয়ারি টেস্ট। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরাই মেন পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবে। এরপর মেধা তালিকা অনুযায়ী বাছাইকৃত ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি নেওয়া হবে। ভর্তির পুরো প্রক্রিয়া শুরু হবে ছয় মাস আগেই।
এছাড়াও তিনি জানান, ভর্তি নেওয়ার সময় ছাত্রছাত্রীর আর্থিক অবস্থা, তারা গরিব বা এতিম কিনা—এসব বিষয় কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। তিনি বলেন, “শুধু মেধা নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধের কথাও আমাদের ভাবতে হবে”।
নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, “এই কাজের জন্য আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে ছুটে বেড়াচ্ছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে আল আমীন মিশনের সংসার চলছে। পাঁচজনের সংসার চালানোর অভিজ্ঞতা দিয়ে ২৫ হাজার মানুষের সংসারের দায়িত্ব বোঝা যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকে একটি ছোট সংসার চালাতেই রাগারাগি করে, রাতে ঘুমের ওষুধ খায়। আলহামদুলিল্লাহ, এত বড় একটি মিশন পরিবার পরিচালনা করেও আমার কখনও ঘুমের সমস্যা হয়নি।”
কারো কারো সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি টিডিএন বাংলাকে বলেন, “৫০ বছর আগে যখন মুষ্টির চাল তুলে বেড়াতাম, তখনও সমালোচনা ছিল। তখন ফেসবুক ছিল না, মাচায় বসে গীবত হতো। ৪০ বছর আগেও সমালোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে ভাবলে কাজ করা যায় না। আমি আমার কাজ করে গেছি, এখনও করে যাচ্ছি।”
মিশনে শুধু মেধাবীদের নেওয়া হয়। মেধাবীদের রেজাল্ট তো ভালো হবেই। এক্ষেত্রে মিশনের কৃতিত্ব কোথায়? টিডিএন বাংলার এমন প্রশ্নের জবাবে এম নুরুল ইসলাম বলেন, “মেধাবীদের নিয়ে রেজাল্ট করতে সবাই পারে। কিন্তু আল আমীন শুরু হওয়ার আগে তো মেধাবী ছাত্রছাত্রী ছিলই। প্রশ্ন হলো, তাদের তৈরি করা হয়নি কেন? আসলে শিক্ষার জন্য নার্সারিং দরকার। সেই নার্সারিংয়ের কাজটাই আল আমীন মিশন করেছে।”
তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, “মাদ্রাসায় শিক্ষা অর্জন মানেই পিছিয়ে পড়া নয়। মাদ্রাসা থেকেই সৎ, ঈমানদার ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি হয়।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আল আমীন মিশন গড়ে উঠেছে ৯২ শতাংশ অমুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়, যা সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নুরুল ইসলাম বলেন, “আমার সঙ্গে যাঁদের যোগাযোগ হয়েছে, তাঁরা সবাই পজেটিভ মনের মানুষ। কেউ রাজ্য চালাচ্ছেন, কেউ দেশ চালাচ্ছেন, কেউ সমাজকে কিছু দিয়ে যাচ্ছেন। ভালো ও উদার মনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলে চিন্তাভাবনাও পজেটিভ হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যাঁরা ধৈর্যশীল ও সহনশীল, আল্লাহ তাঁদের সঙ্গেই থাকেন।”
টিডিএন বাংলার সম্পাদক মোকতার হোসেন মন্ডলের সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি জীবনসংগ্রামের এক গভীর দর্শন তুলে ধরে বলেন,“সফল মানুষের জীবন একটি প্রবাহিত নদীর মতো। তার পথে পাহাড়, পর্বত, নুড়ি-পাথর, আবর্জনা ও হাজারো বাধা আসে। কিন্তু নদী থামলে চলবে না। সব যন্ত্রণা সহ্য করেও তাকে সাগরে গিয়ে মিশতেই হবে। তবেই নদী ও জীবন—উভয়ই সার্থক হয়।”
