যাচ্ছি মদিনার পথে। নয়দিন দিন কাবাকে প্রাণ ভরে দেখলাম। এক আশ্চর্য মায়া ছেড়ে যেতে হচ্ছে আরেক মায়ায়। মাকামে ইব্রাহিমের সেই ইতিহাসবাহী স্থান, সাফা-মারওয়ার দৌড়, জমজমের শীতল জল, আর লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না-মেশানো দোয়ার স্রোত—সবকিছু যেন হৃদয়ের দেয়ালে খোদাই হয়ে রইল চিরদিনের জন্য।

কাবাকে প্রদিক্ষণ করে মাঝে মাঝে গেছি গারে সাওর, হেরা গুহা, আরাফা, জিন মসজিদ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ি, ঝুলন্ত মসজিদ, অন্ধকার যুগে যেখানে নারীদের হত্যা করা হতো সেই জায়গায়,ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া রা. কবর, তায়েফ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। মা খাদিজা রা. কবর জিয়ারত সম্পন্ন হয়েছে।
হক বাতিলের দ্বন্দ্বই যে পৃথিবীর ইতিহাস- সেটা উপলদ্ধি করলাম। বর্বর, জঘন্য একটা সমাজ সংস্কৃতি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে কীভাবে সভ্যতার বিকাশে ভূমিকা নিল- ভাবলেই অবাক হই!
এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বিশ্ব নবীকে চূড়ান্ত ধৈর্য্য ধরে দয়ার সাগরের ভেলা ভাসাতে হয়েছে। মক্কা থেকে তায়েফ, প্রতিটি জনপদে লুকিয়ে আছে এক একটা ইতিহাস।
পবিত্র কুরআন ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস পড়ে যতটুকু জেনেছি – এই পথ খুব কঠিন। আর এখানে এসে যা বুঝলাম, সারা দুনিয়ায় সাহাবাদের কবরস্থান আছে। কেননা গোটা দুনিয়ায় তারা ইসলাম প্রচারের জন্য চলে গেছেন। কেউ ঘরে ফিরেছেন, কেউ বা ফেরেননি। নবী, রাসূল, সাহাবীদের পাহাড়সম কষ্টের মধ্য দিয়ে আমরা ইসলাম নামক সুমহান আদর্শ পেয়েছি।
কাবায় রোজ লক্ষ লক্ষ মুসলমান দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা আসা যাওয়া করছেন। পৃথিবীর হাজার হাজার ভাষার মানুষ, হাজার হাজার বংশের লোক মাকামে ইব্রাহিমে অশ্রুসিক্ত নয়নে ফরিয়াদ করছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, পুরুষ থেকে মহিলা, যেন একটা সমুদ্রের ঢেউ খেলানো জনপদ। নেই সাদা কালোর ভেদাভেদ। নেই উচ্চ বর্ণ কিংবা নিম্ন বর্ণের দ্বন্দ্ব। নেই ধনী ও গরীবের বৈষম্য। কে পঙ্গু? কে ভিখারী? কে হাজার কোটির মালিক? সব এক কাতারে।
এখানে নেই কাঁটাতার। এখানে নেই রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঝগড়া। পাখি, বাতাস, জল কিংবা মাটি- এক দেশ থেকে আরেক দেশ – যে নামেই ডাকুন না কেন, সব এক দেহে লীন! সবাই স্রষ্টার নির্দেশ মানছে। মানচিত্র কিংবা সিকিউরিটির বেড়া বিষয়টি তারা বোঝে না, দরকারও পড়ে না। তেমনি গোটা পৃথিবীর হজ্বযাত্রী নামক মুসাফির রাষ্ট্রীয় পাসপোর্ট নিয়ে কাবায় এলেও, এক সমুদ্র সৈকতে বিনিসুতি মালা গেঁথে চলেছেন। ধর্মের নামে, ভাষার নামে, দলের নামে, বংশের নামে কোন জাতীয়তাবাদী কচকচানি এখানে নেই। ভাষা যেমন পাসপোর্ট কিংবা কাঁটাতারের ব্যারিকেড মানতে চায়না তেমনি কাবা দেশি বিদেশি বোঝে না। এখানে সবাই সমান। কারো জন্য স্পেশাল ফ্যাসিলিটি নেই।
মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ, নেতা সব এক সারিতে। কে বিজ্ঞানী, কে মাঠের চাষী বোঝা মুশকিল। সবাই সাদা এহরাম পরে বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের কাছে মাথা নত করছেন। এখানে রাজা বাদশাদের দেখার জন্য জনতার ভিড় নেই। মানুষ শুধু কাবার দিকে তাকাচ্ছে আর আল্লাহর যিকির করছেন।
ইমাম যখন নামাজে ক্বিরাত পড়ছেন, মনে হচ্ছে যেন কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছে। নামাজেও চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে লাখ লাখ মুসলিমের মুখমন্ডল। কিছুদিন থাকতে থাকতে কাবার এক অদৃশ্য আকর্ষণ আপনাকে যেন বেঁধে রাখবে। ঘরে যেতে মন চাইবে না। বাস্তবের মাটিতে আছেন অথচ আপনার আত্মাকে নিয়ে যাবে এক অলৌকিক জগতে। কুরআন পড়ার সময়, নামাজ পড়ার সময়, তওয়াফ করার সময় আপনি স্বর্গীয় সুখ অনুভব করবেন।
এখান থেকে রাতের আকাশ দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগে। হাজার হাজার পায়রা কাবার বাইরে খেলছে। হাজিরা শস্য দানা খেতে দিচ্ছেন। চমৎকার দৃশ্য!
এখানে রোজ তাহাজ্জুদের আযান ও নামাজ হয়। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর জানাজার নামাজ হচ্ছে।
জুম্মার দিন দুই আযান হচ্ছে। মসজিদের আকাশচুম্বী মিনার থেকে ভেসে আসে প্রথম আজানের সুমধুর ধ্বনি। মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় আজান, যেন আকাশ-জমিনকে এক সুতোয় বেঁধে দিল। খুতবা শুরু হয়—ইমাম সাহেবের কণ্ঠে কুরআনের আয়াত, নসীহত আর ভালোবাসা মিশে থাকে।

হঠাৎ তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, চোখের কোণ ভিজে যায়। তিনি কেঁদে কেঁদে দোয়া করছেন—আল্লাহর দরবারে যেন মন খুলে নিবেদন করছেন। তাঁর কণ্ঠের কম্পন, শব্দের ভেতরকার ব্যাকুলতা মসজিদের প্রতিটি হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। মুক্তাদিরাও আর সংযত থাকতে পারেন না—চিৎকার করে, হাহাকার মিশিয়ে, চোখের জল ফেলতে ফেলতে সাড়া দেন সেই দোয়ায়।
ব্যাক্তি বা রাষ্ট্রের ভুলের উদাহরণ দিয়ে মুসলিমদের বিচার শুরু করতে বসলে হবে না; ইসলামের সাম্যবাদী ও ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থা- মহাবিশ্বের এক মহা বিস্ময়! আরব-অনারবের অহংকার ইসলাম ভেঙে দিয়েছে।
সহস্র বছরের ইতিহাসকে অল্প দিনের জন্য দেখলাম। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে কাঁদতে কাঁদতে অনেকে বেঁহুশ হয়ে যাচ্ছেন। অনেকে চীৎকার করে বলছেন – ইয়া আল্লাহ্…. ইয়া আল্লাহ্… ইয়া আল্লাহ্…। অনেকে সিজদায় পড়ে গিয়ে আর উঠছেন না। এটা শুধু আবেগ নয়, এটাই জীবনের কঠিন বাস্তবতা। যারা জ্ঞানী কেবল তারাই এই অদৃশ্য শক্তির বিষয়টি কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন। কী সহমর্মিতা! কী ভাতৃত্ব! কী অপরূপ সৌন্দর্য!
কাবায় খাবারের অভাব নেই। আল্লাহর মেহমানদের সেবা করতে কত লোক যে অপেক্ষা করছে- এলেই বুঝতে পারবেন! চেনা নেই, জানা নেই, কোন দেশের যে কে তার খোঁজ নেই – অথচ সব যেন আপন মায়ের ভাই- বোন! সবার মধ্যে কী মিল! এখানে না এলে বুঝতে পারবেন না। কিংবা আপনি এলেও আপনার ভিতরে গ্রহণ করার অনুভূতি না থাকলে বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবেন না।
শেষদিন ফজরের সময় কয়েকফোঁটা বৃষ্টি খোলা আকাশ থেকে গায়ে পড়লো। যেন জান্নাতি পানি। এই সময় হাজিরা আল্লাহ্ আকবার ধ্বনি দিল। সকালে মনে হল, হাজিদের চোখের জল সংগ্রহ করলে প্রতিদিন একটা করে খাল লাগবে।
কাবাকে বিদায় জানিয়ে ফেরার সময় এক চমৎকার দৃশ্য দেখতে পেলাম। অনেকে কাবাকে ছুঁয়ে হাতের আঙ্গুলকে কলম বানিয়ে কল্পনায় নিজের নাম লিখছেন। কেউ কেউ স্বপ্নগুলিকে বাক্যের মতো আঁকছেন।
এখন চলেছি মদিনায়—সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত প্রিয় নবী (সা.)। সেখানেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের প্রথম ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে নেমে এসেছিল ইসলামের সোনালি বিধান। আল্লাহ্ চাইলে সেখানকার অভিজ্ঞতাও একদিন আপনাদের শোনাব।
আল্লাহ্ যখন আপনাদের মোকতার হোসেন মন্ডল ভাইকে লেখার কিছুটা শক্তি দিয়েছেন, তখন কিছু কথা লিখতেই হবে। ইসলামের কথা, মূল্যবোধের কথা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরতে হবে। আমি চাইবো, আপনারা যারা হজ ও উমরাহ করতে আসবেন তারাও অভিজ্ঞতার কথা নিজের ফেসবুকে লিখবেন, পেপারে লিখবেন। পারলে বই লিখবেন। ইসলামের কথা যত প্রচার করবেন তত নেকি পাবেন। বিশ্ব সভ্যতাকে নাড়িয়ে দেওয়া ঘটনা স্থলের উপর দিয়ে হাঁটবেন অথচ মনের মনিকুণ্ঠে সুর ঝনকৃত হবে না, এটা কেমন হৃদয়? আমরা তো জড় নই।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা – আল্লাহ কলম দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি চাইবো- জড়তা, অলসতা ঝেড়ে ফেলে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলেছে এমন ঘটনা ছোট ছোট করে লিখে রাখুন। আজকের যুগে এটা খুব সহজ। কত কবি, কত সাহিত্যিক, কত ঐতিহাসিক, কত বিজ্ঞানী, কত পন্ডিত কাবা নিয়ে, তায়েফ নিয়ে, গারে হেরা নিয়ে লিখেছে তার হিসাব নেই। আল্লাহর ঘর, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের সংগ্রামী জীবন কাহিনী আপনার বক্তৃতায়, কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধ ও তথ্যে চিত্রে উঠে আসা দরকার। আপনার সৃজনশীল কাজকর্ম সাদগায়ে জারিয়া হিসাবে কাজ করবে ইনশাআল্লাহ। যদি ভালো লিখতে না পারেন, বলতে না পারেন তবে অল্প অল্প করে অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলুন। উৎসাহিত করুন হজের জন্য।
প্রায় এক বছর আগে বাংলার শিশু সাহিত্যিক সাংবাদিক মোহাম্মদ নুরুদ্দীন স্বপরিবারে উমরাহ করেছেন। ঘরে ফিরে লিখেছেন- দুটি নাতিদীর্ঘ অসাধারণ কবিতা। তিনি তাঁর লেখা পড়েছেন আর আমি শুনেছি। বাংলা সাহিত্যকে ‘মক্কা মদীনার পথে’ নামে একটি বই উপহার দিয়েছেন।
জীবনে তো দলের জন্য, বিয়ে শাদীর জন্য, অসুখ বিসুখের জন্য কিংবা গুটকা- পান জর্দা, বিড়ি সিগারেটটের জন্য অনেক খরচ করলেন, এবার একটু নিজের আত্মিক শান্তির জন্য কাবার পথে আসুন।
প্রিয় ভাই-বোনেরা, ইসলামের পথ কখনো ফুলে ঢাকা লাল গালিচা নয়। এ পথ দুর্গম, এ পথ ত্যাগের, ধৈর্যের, পরীক্ষার। সত্যের জন্য মার খাওয়া, অপমানিত হওয়া, এমনকি প্রিয় সবকিছু ছেড়ে দিয়ে পরবাসে চলে যাওয়া—এসবই এ পথের অংশ। সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্ব থাকবেই। ক্ষণস্থায়ী এই মিছে দুনিয়ায় শয়তানের ফাঁদে পড়ে আমরা বিভ্রান্ত হই। এই দুইদিনের পৃথিবী একটা পরীক্ষাগার। আমাদের মতো সংসার, আমাদের মতো জীবন কাটিয়ে কোটি কোটি বনি আদম দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে।
আমরা নিজেকে খুব চালাক মনে করি। আসলে আমরা বুঝতেই পারছি না, মহান প্রভুর ইবাদত ছেড়ে দিয়ে আমরা নিজের সঙ্গে নিজেকে ধোকা দিচ্ছি। খুব ভালো ভাবে দেখলে, আমরা নিজেকেই তো ভালোবাসি না, তাহলে আমরা এই সমাজ, এই বিশ্বকে কীভাবে ভালবাসবো? আমাদের চেয়ে কত বড় বড় পন্ডিত দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে – ভেবেছি কী? আর ভাবলেও শয়তানি প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছি কি? বোধহয় নয়।
আত্মশুদ্ধির জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করবো? চলুন আজ থেকে শুরু করি নতুন পথ চলার। নোংরা রাজনীতি, নোংরা চিন্তাভাবনা ছেড়ে দিন। মিথ্যা লালসা নয়, আসুন পবিত্র এক সংগ্রামী জীবন গড়ে তুলি। আসুন গড়ে তুলি একটা বৈষম্যহীন সমাজ। আসুন নিজের জমানো হিংসা বিদ্বেষ সাফ করি। আসুন প্রীতিপ্রেমের বন্ধনে পরস্পরকে আগলে রাখি।
শান্তি বিরাজ করুক আমাদের পরিবারে। ঐক্য ও সংহতির ছায়া নেমে আসুক আমাদের দেশে।