যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ২৭ বছর বয়সি মুসলিম তরুণী নাবিলা সৈয়দ। ডেমোক্রেটিক পার্টির এই প্রার্থী পরাজিত করেছেন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর ডার্বি হিলসকে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, নাবিলা পেয়েছেন ৫৭ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ডার্বি হিলসের ঝুলিতে গিয়েছে ৪৩ শতাংশ ভোট। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ৯৪ শতাংশ ভোট গণনার পর এই ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
জয়ের পর সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে নাবিলা বলেন, তাঁদের প্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি তুলে ধরা। শুধু নির্বাচনে জয়লাভ নয়, বরং সহমর্মিতা ও মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতাকে সামনে রেখেই তাঁরা প্রচার চালিয়েছেন।
ইলিনয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরতলির এই আসনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অর্থ ব্যয় হয়েছে। অঙ্গরাজ্যের আইনসভা নির্বাচনের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল লড়াই হিসেবে বিবেচিত এই নির্বাচনে দুই প্রার্থীর প্রচারে মোট ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইলিনয়ভিত্তিক সংস্থা রিফর্ম ফর ইলিনয়ের নির্বাহী পরিচালক আলিসা কাপলান।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাবিলার নির্বাচনী প্রচারে অন্তত ৪৭ লাখ ডলার অনুদান এসেছে। এর মধ্যে ৩০ লাখ ডলারেরও বেশি দিয়েছে ইলিনয় ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ইলিনয় সিনেট ডেমোক্রেটিক ফান্ড। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন থেকেও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী ডার্বি হিলসের নির্বাচনী প্রচারে এসেছে প্রায় ১৮ লাখ ডলার।
নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করেছেন ডার্বি হিলস। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারে অসৎ কৌশল অবলম্বন করেছে প্রতিপক্ষ শিবির। নাবিলার বিরোধিতায় গত মাসে ‘স্ট্রং ইন্ডিপেনডেন্ট লিডারশিপ কমিটি’ নামে একটি রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিও গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ভিন্স ফোগলিয়া নিজে পাঁচ লাখ ডলার অনুদান দেন। পাশাপাশি তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ডার্বির নির্বাচনী প্রচারেও আরও পাঁচ লাখ ডলার দেন।
২০২১ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাস থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন নাবিলা। এরপরই ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের ৫১তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হন তিনি। বর্তমানে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। ইলিনয়ের আইনসভায় নির্বাচিত সর্বকনিষ্ঠ নারীদের একজন এবং অল্প কয়েকজন মুসলিম সদস্যের মধ্যে অন্যতম নাবিলা।
অন্যদিকে, ড্যান ম্যাককনচির পদত্যাগের পর তাঁর ছেড়ে যাওয়া আসনে নিযুক্ত হয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সি ডার্বি হিলস। পেশায় সরকারি কৌঁসুলি ডার্বি ২০২১ সালে ‘মিসেস ইলিনয় আমেরিকা’ খেতাবও জিতেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে জননিরাপত্তা, শিশুদের সুরক্ষা, কর হ্রাস এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।
প্রচারের সময় নাবিলার বয়স ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাবকে ইস্যু করেছিলেন ডার্বি। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে নাবিলাকে নিজের এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত চরমপন্থি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রচারে মুসলিমবিরোধী মনোভাব ও বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে আনেন নাবিলা। তাঁর অভিযোগ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে গেলে তাঁকে নানা ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ ও হুমকিমূলক মন্তব্যের মুখে পড়তে হয়েছে। নাবিলা বলেন, ‘এই এলাকাতেই আমার বেড়ে ওঠা। অথচ আমাকে বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছে যে আমি এই দেশেই জন্মগ্রহণ করেছি।’
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা সহজলভ্য করা নিজের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন নাবিলা। পাশাপাশি ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের উপর আরও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও দুই প্রার্থীর মধ্যে মতৈক্য ছিল।
সব মিলিয়ে, ২৭ বছর বয়সে ইলিনয়ের সিনেট নির্বাচনে নাবিলার এই জয় মার্কিন রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে উঠে এসেছে।




