অশনাক্ত দেহের গণকবর, ডিএনএ সংরক্ষণ নেপালে, নিখোঁজ ৩ হাজার, মৃত্যু বাড়ছে হু হু করে

ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বানের পর কেটে গিয়েছে পাঁচ দিন। এখনও নেপালে নিখোঁজ বহু মানুষ। এত দিন তাঁদের বেঁচে থাকার ‘মিরাকেল সম্ভাবনা’য় বুক বেঁধেছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু হাসপাতালের মৃত্যুর তালিকা এবং উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের ছবি সেই আশাতেও ইতি টানছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে হাসপাতালের মর্গগুলিতে। ইতিমধ্যে নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৭৮৮টি দেহ। এর মধ্যে বহু দেহ এখনও অশনাক্ত। মর্গগুলিতে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে মর্গের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে মৃতদেহ পড়ে থাকলে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে। পচাগলা দেহ থেকে সংক্রমণ ও মড়কের আশঙ্কাও রয়েছে। সময় যত গড়াবে, দেহ শনাক্ত করাও তত কঠিন হয়ে পড়বে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে অশনাক্ত দেহগুলিকে গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চিতওয়ান জেলা প্রশাসন। এক আধিকারিক বলেন, “অশনাক্ত দেহের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বাড়িগুলিতে শীতাতপ ব্যবস্থা করে সেখানেই দেহ রাখা হচ্ছে। সেখানেও আর জায়গা নেই। তাই দেহ কবর দেওয়া ছাড়া বিকল্প কী?”

তবে দেহগুলি যাতে পরবর্তী সময়ে শনাক্ত করা যায়, সেই ব্যবস্থা রেখেই কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কবর দেওয়ার আগে প্রতিটি দেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে।

শনিবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডিএনএ নমুনা নেওয়ার পর দেহ বা দেহাংশ নির্দিষ্ট ব্যাগে ভরে কবর দেওয়া হবে। প্রতিটি ব্যাগে থাকবে একটি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর। পাশাপাশি প্রতিটি কবরের জিও-লোকেশনও সংরক্ষণ করা হবে।

পরবর্তী সময়ে কোনও নিখোঁজ ব্যক্তির নিকটাত্মীয় দাবি করলে তাঁর ডিএনএর সঙ্গে সংরক্ষিত নমুনা মিলিয়ে দেহ শনাক্ত ও পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

শনিবার পর্যন্ত ১০০টি দেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলি দ্রুত কবর দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

দেহ কবর দেওয়ার জন্য প্রায় দেড় মিটার গভীর গর্ত খোঁড়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনও একটি দেহ তুলতে হলে যাতে পাশের দেহ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রতিটি দেহের মধ্যে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রাখা হচ্ছে।

কবর দেওয়ার আগে প্রতিটি দেহের ছবি ও ভিডিয়ো করা হচ্ছে। কবরের কংক্রিটের স্ল্যাবে লেখা থাকবে জিও-লোকেশন এবং ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর। ফলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট দেহটি চিহ্নিত করে তোলার সুযোগ থাকবে।

এদিকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রাসুয়া ও ধাদিং জেলায় এখনও স্বস্তির কোনও কারণ দেখছেন না আবহাওয়াবিদরা। অভিশপ্ত ভোটেকোশী নদীর জলস্তর রবিবার ফের বাড়তে শুরু করেছে।

এর পাশাপাশি উচ্চ অববাহিকায় জলস্তর বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে নেপালি কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে চীন। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে।

বিপর্যস্ত নেপালে এখন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য রাজধানী কাঠমাণ্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রাস্তাঘাট থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। বিভিন্ন পরিকাঠামো নির্মাণকর্মীদেরও সতর্ক করা হয়েছে।

তবে প্রশাসনের বারবার সতর্কবার্তায় স্থানীয়দের আতঙ্ক কাটছে না। স্থানীয় বাসিন্দা গোবিন্দ শ্রেষ্ঠ বলেন, “একবার বলা হচ্ছে, বন্যা আসছে। তখন আমরা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছি। বৃষ্টিও হচ্ছে যথেষ্ট। আমার ৭২ বছরের বাবা এবং ৭০ বছরের মাকে এইভাবে নিয়ে উপরে ওঠা অসম্ভব। হাঁপিয়ে উঠেছি।”

নেপালের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী জানিয়েছে, রবিবার বিকেল পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ৮ হাজার ৭৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশের এই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রথম থেকেই পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। আগেই ত্রাণসামগ্রী ও ওষুধ নিয়ে কাঠমাণ্ডুর উদ্দেশে রওনা হয়েছিল উদ্ধারকারী দল। রবিবার আরও ৬৮.৫ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি উদ্ধারকারী দল নেপালে পৌঁছেছে।

এদিকে কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে নেপালের পথে যাওয়া বহু ভারতীয় পুণ্যার্থীর এখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছেন কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশের একদল পুণ্যার্থী।

চা পানের জন্য মাত্র ১০ মিনিটের বিরতিই তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পেমাস্বামী ভেঙ্কটরামন। তাঁর কথায়, “নেপাল-তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া স্যাব্রুবেসিতে আমাদের পৌঁছনোর কথা ছিল। তবে চা পানের জন্য ১০ মিনিটের একটি বিরতি আমাদের ২৮ জনকে বাঁচিয়ে দিল। দুর্যোগের খবর পেয়ে গাড়ির চালক বিকল্প পথ ধরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান।”

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানে একদিকে যেমন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, অন্যদিকে তেমনই দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজের তালিকা। অশনাক্ত দেহের গণকবর, ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ এবং নতুন করে জলস্তর বৃদ্ধির সতর্কবার্তা-সব মিলিয়ে এখনও গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বিপর্যস্ত নেপাল।

Exit mobile version