একই উঠোনে মসজিদ-মন্দির, ৮৩ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য নজির বাংলাদেশের লালমনিরহাটে

একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে মসজিদ ও মন্দির। দুই উপাসনালয়ের দূরত্ব মাত্র ছয় ফুট। একদিকে মন্দিরে পূজার ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের আওয়াজ, অন্যদিকে মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজান। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের এই ভিন্নতা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৮৩ বছর ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার নজির গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকা।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালী মন্দিরে এখন ভক্তদের ভিড়। পূজার আনুষ্ঠানিকতা, ঢাকের বাদ্যি আর দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর মন্দির প্রাঙ্গণ। ঠিক পাশেই পুরান বাজার জামে মসজিদে নির্বিঘ্নে চলছে নামাজ আদায়। নামাজের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র। দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে এই পারস্পরিক সমঝোতা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।

মন্দিরের সভাপতি ও প্রধান পুরোহিত শংকর চক্রবর্তী জানান, বিষয়টি তাঁদের কাছে কোনো চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা স্বাভাবিক অভ্যাস। তাঁর কথায়, দুর্গাপূজা হোক কিংবা ঈদ-প্রতিটি উৎসবের আগে মসজিদ ও মন্দির পরিচালন কমিটির সদস্যরা একসঙ্গে বসে আলোচনা করেন। আজান ও নামাজের সময়সূচি অনুযায়ী পূজার অঞ্জলি, আরতি এবং সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা হয়। তাঁর দাবি, জন্মের পর থেকে এই প্রাঙ্গণে সামান্য বিশৃঙ্খলাও তিনি দেখেননি।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮৩৬ সালে এই প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয় কালীবাড়ী মন্দির। পরবর্তী সময়ে এলাকাটিকে কেন্দ্র করে বাজার গড়ে উঠলে ব্যবসা করতে আসা একদল মানুষ ১৯২৫ সালে মন্দিরের এক কোণে একটি নামাজঘর নির্মাণ করেন। কালক্রমে সেই নামাজঘরই পুরান বাজার জামে মসজিদে পরিণত হয়।

দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রাঙ্গণটি ছোট থাকলেও দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিধি বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও বহু মানুষ এই সম্প্রীতির নজির দেখতে আসেন। অতীতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদেশি কূটনীতিকরাও এই প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেছেন বলে বাংলাদেশের পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে।

পুরান বাজার জামে মসজিদের খতিব মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের মতে, এই সহাবস্থান কোনো বাহ্যিক প্রদর্শন নয়, বরং একে অপরের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধার প্রকাশ। তিনি বলেন, মন্দিরটি মসজিদের আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও দুই পক্ষ কখনো একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেনি। নামাজের সময় মন্দির কর্তৃপক্ষ যেমন বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রেখে মুসল্লিদের প্রার্থনার সুযোগ করে দেন, তেমনই মসজিদ কর্তৃপক্ষও পূজার সময় নিরাপত্তা ও সহযোগিতার বিষয়ে সচেতন থাকেন। তাঁর মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতাই ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রকৃত ভিত্তি।

এই সম্প্রীতির প্রভাব পড়েছে স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও। দুর্গাপূজা কিংবা ঈদ—উভয় সম্প্রদায়ের তরুণেরা একসঙ্গে এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং উৎসবের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ধর্মীয় সহাবস্থান এখানে কেবল উপাসনালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে দৈনন্দিন জীবনেও।

স্থানীয় বাসিন্দা জগদীশ চন্দ্রের কথায়, এই প্রাঙ্গণ সম্প্রীতির একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে সময় মেনে সবকিছু পরিচালিত হয়, যাতে এক ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান অন্য ধর্মের মানুষের প্রার্থনায় বাধা সৃষ্টি না করে।

লালমনিরহাটের এই ঐতিহ্যকে জেলার মানুষের সহাবস্থানের মানসিকতার প্রতিফলন বলে মনে করেন জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান। তাঁর মতে, একই প্রাঙ্গণে ঘড়ির কাঁটা মেনে আজান ও আরতির এই সুশৃঙ্খল সহাবস্থান শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের কাছেও শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে।

একই আঙিনায় মন্দিরের প্রদীপ আর মসজিদের মিনার আজ লালমনিরহাটের মানুষের কাছে কেবল দুটি ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক নয়। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে জায়গাটি হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

Exit mobile version