ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ইসলামি ব্যক্তিগত আইন রক্ষার দাবিতে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের ডাক মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের

ভারতের সংবিধান, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শরিয়া বা ইসলামি ব্যক্তিগত আইন রক্ষার দাবিতে দেশব্যাপী জনআন্দোলনের ঘোষণা দিল অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড (এআইএমপিএলবি)। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রধান শহরে জনসভা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি।

নয়াদিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই কর্মসূচির ঘোষণা করে বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘সংবিধান ও শরিয়া রক্ষার আন্দোলন’ কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর আন্দোলন নয়। এটি ভারতের সংবিধান, গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব, আইনের শাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা, জাতীয় ঐক্য, শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষার একটি সম্মিলিত জাতীয় উদ্যোগ।

বোর্ডের প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির সুরক্ষা, মর্যাদা এবং আইনের সমান প্রয়োগের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিমরা ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে বোর্ড।

এআইএমপিএলবি-র অভিযোগ, গণহিংসা, আইনবহির্ভূতভাবে বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর ভাঙা, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজারকে লক্ষ্যবস্তু করা, ওয়াকফ সম্পত্তি ও কবরস্থান দখল, ভিত্তিহীন মামলায় মুসলিম যুবকদের গ্রেফতার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে।

পাশাপাশি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসির মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকে দুর্বল করার চেষ্টা এবং ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার মতো উদ্যোগ সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করছে বলেও অভিযোগ করেছে বোর্ড।

তাদের বক্তব্য, এই বিষয়গুলি শুধু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে ভারতের সাংবিধানিক পরিচয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য জড়িত।

এই আন্দোলনের সমন্বয়ের জন্য একটি কর্ম কমিটি বা ‘মজলিস-এ-আমল’ গঠন করা হয়েছে। দেশের প্রধান শহরগুলিতে আলেম, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণে জনসভা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছে বোর্ড।

এছাড়া সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলিকে নথিবদ্ধ করে একটি বিস্তারিত শ্বেতপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই শ্বেতপত্র গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে তুলে দেওয়া হবে।

অবৈধ উচ্ছেদ ও বুলডোজার অভিযানের ক্ষেত্রে নাগরিকদের আইনি অধিকার, বিচারিক প্রতিকারের সুযোগ এবং বাস্তব করণীয় সম্পর্কে একটি আইনি নির্দেশিকাও প্রকাশ করবে বোর্ড। পাশাপাশি ওয়াকফ সম্পত্তি, কবরস্থান, মসজিদ ও মাদ্রাসার সুরক্ষার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রতিটি রাজ্যের রাজ্যপাল এবং জেলার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে একটি বিস্তারিত দাবি সনদ পেশ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সেখানে সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, বিদ্বেষমূলক অপরাধ প্রতিরোধ, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বেআইনি উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা এবং আইনের সমান প্রয়োগের মতো বিষয় তুলে ধরা হবে।

জামায়াতে ইসলামি হিন্দের আমির এবং এআইএমপিএলবি-র সহ-সভাপতি সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনি বলেন, প্রস্তাবিত এই প্রচারাভিযান ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। এর পরিবর্তে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে উৎসাহিত করা হবে।

বোর্ডের মুখপাত্র ও সংগঠক ড. এসকিউআর ইলিয়াস বলেন, “এগুলো কেবল একটি সম্প্রদায়ের বিষয় নয়; এগুলো ভারতের সাংবিধানিক পরিচয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অভিন্ন জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।”

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বোর্ডের সহ-সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ আলি মহসিন তাকভি, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ ফজলুর রহিম মুজাদ্দিদী, সেক্রেটারি মাওলানা ডক্টর ইয়াসিন আলি উসমানি, বিধায়ক আরিফ মাসউদ, মাওলানা মো. আবু তালিব রহমানী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

Exit mobile version