সরকারি হাসপাতালের পরিষেবাকে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং জনবান্ধব করে তুলতে এবার কড়া পদক্ষেপের পথে রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার নবান্নে যাওয়ার আগে আচমকাই স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছে নবগঠিত ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুম পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে উপস্থিত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি পরিষেবার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই কন্ট্রোল রুম থেকেই রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হবে। তাঁর দাবি, হাসপাতালগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দালালচক্রের দৌরাত্ম্য রুখতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনও দালালকে আজ হাসপাতালে দেখা গেলে, কাল আর তাকে দেখা যাবে না। রাজ্যের সব সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা হবে।”
তিনি জানান, আগামী ৩০ জুলাই থেকে কলকাতার পাশাপাশি জেলার সরকারি হাসপাতালগুলিও এই কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে। হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো সিসিটিভির মাধ্যমে লাইভ মনিটরিং করা হবে এবং কোনও অনিয়ম বা অভিযোগ ধরা পড়লেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু নজরদারিই নয়, রোগী পরিষেবার মান উন্নয়নেও একাধিক সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের জন্য দৈনিক বরাদ্দ ৫৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা করা হয়েছে, যাতে খাবারের মান আরও উন্নত করা যায়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের দায়িত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন রঙের পরিচয়পত্র বা ব্যাজ চালুর কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
বড় দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা দিতে ২৫০ জন রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসার উপযোগী একটি অত্যাধুনিক ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
এছাড়া তিনি জানান, নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর উদ্যোগে ২,০০০ শয্যার আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে ১,০০০টি শয্যা সাধারণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। খুব শীঘ্রই ওই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারি হাসপাতালের পরিষেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আরও কার্যকর করার কথা জানিয়েছিল রাজ্য সরকার। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১ জুলাই চিকিৎসক দিবসে স্বাস্থ্যভবনের দ্বিতীয় তলায় চালু হয় ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুম। এখানে চিকিৎসক, সিনিয়র নার্স, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং ডেটা এন্ট্রি অপারেটরসহ মোট ২৮ জন কর্মী তিনটি শিফটে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই কন্ট্রোল রুম একপ্রকার ‘মিনি স্বাস্থ্য দপ্তর’-এর ভূমিকা পালন করবে। রোগী রেফারের আগে গন্তব্য হাসপাতালে শয্যা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের চিকিৎসা ও পরিষেবার মান পর্যবেক্ষণ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত খবরের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ, বড় দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় চিকিৎসা পরিষেবা সমন্বয় এবং হাসপাতালের সন্দেহজনক কার্যকলাপের ওপর নজরদারির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখান থেকেই পরিচালিত হবে। প্রশাসনের আশা, এই আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার ফলে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রোগীসেবা—তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।



