শীত বিদায় নেওয়ার আগেই গরমের আগ্রাসন টের পাচ্ছে দেশ। জানুয়ারির শেষেই কলকাতার রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দেড় ডিগ্রি বেড়েছে। আবহবিদদের পূর্বাভাস, প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তপ্ত জলতলের প্রভাবে (এল নিনো) এ বছর ভারতীয় উপমহাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি কম বৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল অ্যাকোয়াডাক্ট ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস-এর রিপোর্ট।
রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ৩৮টি শহর বর্তমানে অতি উচ্চ জলসঙ্কটের মুখে, যার মধ্যে রয়েছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিও। শুধু তাই নয়, দেশের ২৮টি রাজ্য ও আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে বাংলা-সহ ১৭টি রাজ্যকে ‘হাই রিস্ক জ়োন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী দিনে এই সব রাজ্যে পানীয় জল নিয়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রবল।
রাষ্ট্রপুঞ্জ ইতিমধ্যেই পরিস্থিতিকে ‘গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাঙ্করাপ্টসি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ জলের অবৈজ্ঞানিক ব্যবহার এবং বিপুল জনসংখ্যার চাপে বিশ্বের বহু অঞ্চলে পানীয় জলের ভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান, আফগানিস্তানের কাবুল এবং ভারতের চেন্নাই ইতিমধ্যেই অন্তত একদিনের জন্য ‘ডে জ়িরো’—অর্থাৎ সম্পূর্ণ জলহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। টানা খরার জেরে ইরানের রাজধানী তেহরানও এখন সেই বিপদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে।
সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বড় শহর ভয়াবহ জলসঙ্কটে ভুগছে। এই তালিকায় রয়েছে দিল্লি, বেজিং, নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, রিও ডি জেনেইরো, লন্ডন, জাকার্তা এবং ব্যাঙ্কক। এই শহরগুলিতে মোট বসবাস প্রায় ১১০ কোটির বেশি মানুষের। পাশাপাশি, গোটা বিশ্বে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস তীব্র জলসঙ্কটের মুখে পড়েন।
ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র গঙ্গা-যমুনা দোয়াব এবং গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চল। এই এলাকায় দেশের ৪৫ শতাংশ মানুষের বাস এবং এখান থেকেই আসে দেশের ৪৪ শতাংশ জিডিপি। অ্যাকোয়াডাক্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলা ছাড়াও জলসঙ্কটের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওডিশা, ছত্তিসগড়, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও কেরালা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ জলের লাগামছাড়া ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যদি এ বছরও ফেব্রুয়ারি থেকেই তাপপ্রবাহ শুরু হয় এবং বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়, তবে জুন পর্যন্ত চার মাস জলচাহিদা আকাশছোঁয়া হবে। তার ফলেই দ্রুত ফুরোতে পারে ভৌম জলস্তরের ভাণ্ডার।
সব মিলিয়ে, জলসঙ্কট আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—তা এখন বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা। সময় থাকতেই জল সংরক্ষণ, পরিকল্পিত ব্যবহার এবং সচেতনতা না বাড়ালে বিপর্যয় এড়ানো কঠিন বলেই মনে করছেন পরিবেশবিদরা।





