মানুষ গড়ার কারখানায় যখন স্বপ্ন, সাধনা আর সেবার মিলন ঘটে- সেখানেই জন্ম নেয় ইতিহাস। ঠিক তেমনই এক আবেগঘন, অনুপ্রেরণাময় দিনে আল আমীন মিশন সংবর্ধনা জানাল ২০২৫ সালের ৩১৭ জন ডাক্তারি পড়ুয়াকে, যাঁরা আগামী দিনে শুধু চিকিৎসকই নন, হবেন মানবতার বাতিঘর।
রবিবার, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিন পর্বে অনুষ্ঠিত হয় এই মহৎ আয়োজন। প্রতিটি পর্বে রাজ্যের বিশিষ্ট সংখ্যালঘু প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বরা তাঁদের মূল্যবান বক্তব্যে পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরেন দায়িত্ব, আদর্শ ও মানবিকতার পথচলার গল্প। সম্মাননা হাতে পেয়ে মিশনের ছাত্রছাত্রীরা আবেগে আপ্লুত, চোখে মুখে আনন্দের ছাপ, কারও কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার কাঁপন।
এক ছাত্রী জানালেন, আমি আজ কতটা আনন্দিত বলে বোঝাতে পারবো না। আমার বাবা মা পরিবার খুশি, আর সবটাই হয়েছে আল আমীন মিশনের দৌলতে। তবে এখনো চলার পথ অনেক বাকি, সমাজের পাশে থাকতে চাই।তিনটি পর্বে অনুষ্ঠান হলেও প্রতিটি মুহূর্তে মিলনায়তনের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়েছিল মিশনের প্রস্ফুটিত গোলাপের সুবাস—নতুন আলোচনা, নতুন অতিথি, নতুন অনুপ্রেরণা।
দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই আল আমীন মিশনের সম্পাদক এম নুরুল ইসলাম ছাত্রছাত্রীদের জীবনের লক্ষ্য ও দায়িত্ব স্পষ্ট করে দেন। ডাক্তারি পেশাকে কেবল পেশা নয়—মানবসেবার ইবাদত হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন হৃদয়স্পর্শী একটি হাদিস। সেই হাদিসে অসুস্থ, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের সেবার মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজার শিক্ষা, যা ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের জন্য হয়ে ওঠে জীবনের দিকনির্দেশ।
“মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম ইবনু মাইমুন (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিনে বলবেন, হে আদম সন্তান আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা-শুশ্রুষা করনি। সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমার সেবা শুশ্রুষা করব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, আর তুমি তার সেবা করনি, তুমি কি জানতে না যে, তুমি তার সেবা-শুশ্রুষা করলে আমাকে তার কাছেই পেতে। হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে খেতে দাওনি। সে (বান্দা) বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে আহার করাতে পারি? তুমি তো সারা জাহানের প্রতিপালক।

তিনি (আল্লাহ) বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে আহার চেয়েছিল? তুমি তাকে খেতে দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তুমি তাকে আহার করাতে তাহলে তা অবশ্যই আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। সে (বান্দা) বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে পান করাব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। তিনি (আল্লাহ) বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিল, তুমি তাকে পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পান করাতে, তবে তা আমার কাছে পেয়ে যেতে।”
এরপর এম নুরুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা যদি ফরজ আদায় করি, ওয়াজিব ও সুন্নত পালন করি আর আল্লাহ যে কাজ দিয়েছেন তা পালন করি তাহলে সারাদিন নফল কাজের নেকি পাবো।’
তাঁর মন্তব্য,’পৃথিবী তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তোমরা আল্লাহর বাছাইকৃত।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ইসলাহর কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন,’একা ভালো থাকলে ভালো থাকা যায়না, সকলকে ভালো রাখলে নিজেও ভালো থাকা যায়। অন্যদিকে একা একা নয়,আমরা সকলে মিলে জান্নাতে যাওয়ার চেষ্টা করবো।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের স্পেশাল সেক্রেটারি আরশাদ হাসান ওয়ারসি পড়ুয়াদের উদ্দেশ্যে বলেন,ভালো কথা বলাও সদকা। বুঝিয়ে বলা, এক কথা দুইবার ভালো করে বুঝিয়ে বলাও সদকা।
পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেনী কল্যাণ দপ্তরের মেম্বার সেক্রেটারি তানভীর আফজাল দাবী করেন,’সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখার জন্য আল আমীন মিশনের সম্পাদক এম নুরুল ইসলামকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেওয়ার আবেদন করছি ‘।
তিনি বলেন, ‘এই জীবনে কী করলাম, কী করলাম না আর কী করা উচিত ছিল, সব হিসাব কিয়ামতের দিন দিতে হবে।’
অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে উঠে আসে জীবনের গভীর বার্তা-বয়সে বড় হওয়া নয়, উচ্চতায় বড় হওয়া নয়—ভালো কাজে বড় হওয়াই আসল সাফল্য।
আর জীবনের দৌড়ে কখনও থামতে হলে—একটু থেমে, চারপাশটা দেখে, আবার নতুন শক্তিতে এগিয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এই সংবর্ধনা তাই শুধু সম্মাননার মঞ্চ নয়,এ ছিল স্বপ্নের শপথ, নিজের শেকড়কে চেনা, মানবতার আহ্বান আর আগামী দিনের আলোকবর্তিকার জন্মক্ষণের সাক্ষী।












