প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মিডিয়া উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা সঞ্জয়া বারু কংগ্রেসে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ নিয়ে বরাবরই সমালোচনামুখর, বিশেষ করে বিজেপির লাগাতার রাজনৈতিক চাপের প্রেক্ষিতে।
মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বকাল নিয়ে লেখা তাঁর বই ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’–এর জন্য ব্যাপক পরিচিতি পান বারু। বইটি বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ সেখানে ইঙ্গিত করা হয় যে, মনমোহন সিং সব সময় পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন না এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সরকারের বাইরে থাকা কংগ্রেস নেতৃত্বের দ্বারা প্রভাবিত হতো—যার ইঙ্গিত ছিল তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর দিকে।
তবে এসব বিতর্কের বাইরে মনমোহন সিং ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের নেতৃত্ব, ভারত–মার্কিন সম্পর্ক জোরদার করা এবং ব্যক্তিগত সততার জন্য ব্যাপকভাবে সম্মানিত। রাজনৈতিক অন্দরমহলের ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক হিসেবে বারুর বক্তব্য বরাবরই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।
হায়দরাবাদ পাবলিক স্কুলে আয়োজিত হিস্ট্রি লিটারেচার ফেস্টিভালের ফাঁকে Siasat.com–এর খদিজা ইরফান রহিম ও ওসামা সালমানকে দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক রাজনীতির নানা দিক নিয়ে কথা বলেন বারু।
প্রশ্ন: ইউপিএ আমলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আপনি লিখেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কি ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে? এটি কি ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর?
সঞ্জয়া বারু: নিঃসন্দেহে ক্ষমতা এখন আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। ইউপিএ আমলে আমি লিখেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে। তখন সেটা ঘাটতি ছিল। কিন্তু এখন আমরা একেবারে উল্টো প্রান্তে পৌঁছে গেছি।
প্রশ্ন: মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পর কংগ্রেস নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন আপনি। বিজেপির বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কংগ্রেস কি নিজেকে পুনর্গঠন করতে পেরেছে?
সঞ্জয়া বারু: এখনও না। আমার মতে, কংগ্রেসের সভাপতি হওয়া উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী নন।
প্রশ্ন: কংগ্রেসকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলতে কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করেন?
সঞ্জয়া বারু: সারা দেশে দলীয় নেতৃত্বকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বহু নেতা কংগ্রেস ছেড়েছেন—শরদ পাওয়ার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একসময় চন্দ্রবাবু নাইডুও কংগ্রেসে ছিলেন, জগন মোহন রেড্ডিও দল ছেড়েছেন। যাঁরা বেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের ফিরিয়ে এনে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। কংগ্রেস শুধু রাহুল–প্রিয়াঙ্কা কেন্দ্রিক দল হতে পারে না।
এটাই ইউপিএ নিয়ে আমার প্রধান সমালোচনা। আর এই পরিবারতন্ত্রের রাজনীতিকেই কাজে লাগাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি, যাকে তিনি ‘বংশানুক্রমিক শাসন’ বলে আক্রমণ করেন। কংগ্রেস একটি জাতীয় দল। তাই আমি মনে করি, কংগ্রেসের সভাপতি হওয়া উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—রাহুল বা প্রিয়াঙ্কা নন।
প্রশ্ন: বিরোধী দলগুলির বিরুদ্ধে সিবিআই, ইডির মতো কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকার কারণে অনেক নেতা দল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
সঞ্জয়া বারু: সেখানেই আসল লড়াই। আমরা এখনও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কংগ্রেসকে এমন একটি ছাতা হতে হবে, যার নীচে সব বিরোধী দল একত্রিত হবে। কিন্তু সমস্যা হল, পরিবারতন্ত্রে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বাইরে থেকে কেউ কংগ্রেসে যেতে চাইছে না। এই পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। কংগ্রেসকে আবার প্রকৃত অর্থে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে হবে।
প্রশ্ন: জাতীয় স্তরে বিরোধী জোটগুলো টেকসই হচ্ছে না। ভারতের ভবিষ্যৎ কি জোট রাজনীতি, না কি একদলীয় আধিপত্য?
সঞ্জয়া বারু: ভারতকে কেবল জোট সরকারই শাসন করতে পারে। ভারত নিজেই একটি জোট। আগে কংগ্রেসও ছিল জোটের মতো। আমাদের সমাজের গঠনের কারণে জোট সরকারই বেশি কার্যকর। পরিসংখ্যান দেখুন—১৯৫০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। আর ১৯৮০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত, যখন নরসিংহ রাও, অটল বিহারী বাজপেয়ী ও মনমোহন সিংয়ের জোট সরকার ছিল, তখন গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ। বর্তমানে একদলীয় শাসনে আবার অর্থনীতি মন্থর হয়েছে। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তথ্যই আমাকে বলে দেয়—জোট সরকারই বেশি ফলপ্রসূ।
প্রশ্ন: একদলীয় আধিপত্যকে কি কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে তুলনা করা যায়?
সঞ্জয়া বারু: প্রায়শই তাই হয়। ইন্দিরা গান্ধীর আমলেও আমরা কর্তৃত্ববাদ দেখেছি, মোদির আমলেও তাই দেখা যাচ্ছে। দুই শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রীর শাসনই ছিল কর্তৃত্ববাদী।
প্রশ্ন: আপনার বই অবলম্বনে তৈরি ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটি কি দেখেছেন?
সঞ্জয়া বারু: হ্যাঁ, দেখেছি। খুবই খারাপ। ছবিটির সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক ছিল না। ‘ভিত্তি করে’ বলা হলেও এটি মোটেই ভালো রাজনৈতিক ছবি নয়। ভারতীয় সিনেমায় সত্যিকারের ভালো রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের অভাব রয়েছে।
(সৌজন্যে: সিয়াসাত ডেইলি)




